ঢাকা, বুধবার ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন
বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের ৫০ তম শাহাদাত বার্ষিকী পালন
Reporter Name
ভোলায় বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের ৫০ তম শাহাদাত বার্ষিকী পালন

আর জে শান্ত,ভোলা প্রতিনিধি:  বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের ৫০তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় দরুইন গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন তিনি। সেদিন তিনি একাই লড়াই করে বাঁচিয়েছিলেন সহযোদ্ধাদের জীবন। বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মাদ মোস্তফা কামালের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্বল্প পরিসরে আজ বাদ আসর ভোলা সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল জামে মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

পারিবারিক ভাবে জানা যায়, ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলার হাজিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মাদ মোস্তফা কামাল। পিতা হাবিলদার মো. হাবিবুর রহমান ও মাতা মালেকা বেগম। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর স্ত্রীর নাম পিয়ারা বেগম। আশির দশকে মেঘনা নদীর ভাঙ্গনে দৌলতখান উপজেলার হাজীপুর গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের পৈত্রিক বাড়িটি বিলীন হয়ে যায়।

১৯৮২ সালে সরকার সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নে মৌটুপি গ্রামে কিছু সম্পত্তিসহ তার-পিতা-মাতার জন্য একটি পাকা বাসভবন নির্মাণ করে তাদের পুনর্বাসিত করে। পরে সেই গ্রামের নাম পরিবর্তন করে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল নগর রাখা হয় । এ গ্রামের বাড়িতেই বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের মা মালেকা বেগমসহ পরিবারের অন্যন্য সদস্যরা বসবাস করেন। বাড়ির পাশেই ২০০৮ সালে সরকারিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর’।

মোস্তফা কামালের ছোট বেলা থেকেই স্কুলের পড়ালেখার চেয়ে ভালো লাগত সৈনিকদের কুচকাওয়াজ। নিজেও স্বপ্ন দেখেন একদিন সৈনিক হওয়ার ।

মোস্তফা কামাল ১৯৬৭ সালে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন মোস্তফা কামাল। এর আগে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় আসেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ঘিরে তিনটি প্রতিরক্ষা ঘাঁটি গড়ে তোলে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল। দক্ষিণ দিক থেকে নিরাপত্তার জন্য দরুইন গ্রামের দুই নম্বর প্লাটুনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সিপাহি মোস্তফা কামাল ছিলেন এই প্লাটুনেই। তার কৃতিত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য মৌখিকভাবে তাকে ল্যান্স নায়েকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সিপাহী মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল ১টি মুক্তিযোদ্ধাদের ২ নাম্বার প্লাটুন ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার দিকে এগিয়ে আসা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ঠেকানোর জন্য আখাউড়ার দরুইন গ্রামে অবস্থান নেয়। সংখ্যায় বেশি ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাক-বাহিনীর সাথে মোকাবেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল অদম্য মনোবল। প্রচন্ড ঝুঁকির মধ্যেও মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তত থাকে অস্ত্র হাতে।

১৮ এপ্রিল সকাল থেকেই আকাশে মেঘ ছিল। সকাল ১১টার দিকে শুরু হয় প্রচন্ড বৃষ্টি। একইসাথে শত্রুর গোলাবর্ষণ। মুক্তিযোদ্ধারও পাল্টা গুলি করতে শুরু করলো। শুরু হলো সম্মুখ যুদ্ধ। মেশিনগান চালানো অবস্থায় এক মুক্তিযোদ্ধার বুকে গুলি লাগে। মুহূর্তের মধ্যে মোস্তফা কামাল এগিয়ে এসে চালাতে লাগলেন মেশিনগান। গর্জে  উঠে তার হাতের অস্ত্র ও।

মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে কোন অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল না। সংখায়ও অনেক কম ছিলো তারা। আর পাকিস্থানী সৈন্যরা সংখায় ছিল অনেক বেশি ও ভারি অস্ত্র শস্ত্র সজ্জিত তারা। হয় সামনা সামনি যুদ্ধ করে মরতে হবে, নয় পিছু হটতে হবে। কিন্তুু পিছু হটতে হলেও সময় দরকার, ততক্ষণ অবিরাম গুলি চালিয়ে শত্রুদের আটকিয়ে রাখতে হবে। কে নেবে এই মহান দায়িত্ব?

এমন সময় আরো একজন মুক্তিযোদ্ধার বুকে গুলি বিঁধে। ততক্ষণে মোস্তফা কামাল সকল সহযোদ্ধাকে সরে যেতে বলেন এবং নিজেই সেই দায়িত্ব নেন। ৭০ গজের মধ্যে শত্রুপক্ষ চলে এলেও থামেননি তিনি। পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেননি। এতে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ধাওয়া করতে পারেনি। নিজের প্রাণ দিয়ে পুরো প্লাটুনকে রক্ষা করেন মোস্তফা কামাল । পরিখার মধ্যে সোজা হয়ে চালাতে লাগলেন স্টেনগান। মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ছেড়ে যেতে না চাইলে তিনি আবারো সবাইকে নিরাপদে যেতে বলেন, তার অনুরোধের কারনে সবাই পিচু হটতে শুরু করে , এদিকে অবিরাম গুলি চালাতে থাকেন তিনি। তার গোলাবর্ষণে শত্রুদের থমকে যেতে হয়েছে। মারা পড়েছে অনেক পাক সৈন্য।

ততক্ষণে দলের অন্য সদস্যরা নিরাপদে পিছু হটেছেন। একসময় মোস্তফা কামালের গুলি শেষ হয়ে যায়। হঠাৎ করেই একটি গুলি এসে লাগে তার বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। মারা যান মোস্তফা কামাল। তার অসীম বীরত্বের কারণে সেদিন সহযোদ্ধাদের প্রাণ রক্ষা পায়।  আজকে এই দিনে শ্রদ্ধারসাথে স্মরণ করছি ,জাতির এই সূর্য সন্তান কে।

আখাউড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাঙালির এই বীর সন্তান। তার অসামান্য বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x