ঢাকা, বুধবার ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন
এরদোগানের ভবিষ্যৎ!
আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ

এখন সারা বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের কাছে একটি নাম ঘুরে ফিরে আসে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এরদোগান। মাঝেমধ্যে তিনি হুংকার দেন, তা সত্যিকার না হলেও কিছুটা প্রতিধ্বনি তুলে। তিনি ইসরায়েলকে এক হাত দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পরও;  নির্মাণ ও অন্যান্য সামগ্রী ইসরাইলে পাঠানো বন্ধ করেন নি । নিপিড়ীত মুসলমানদের পক্ষে কথা বলেন; কিন্তু উইগুরদেরকে আবার চিনের হাতে তুলে দেন। এ সবই আসলে তিনি করেন বিশ্ব রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে  কোণঠাসা হওয়া থেকে বাঁচার কৌশল হিসেবে। একদিকে তিনি ইরানের মাসি অন্যদিকে আমেরিকার পিসি। ট্রাম্পের সাথে সেই সরাসরি সম্পর্ক; তখন সবকিছু ঠিকঠাক ছিল; শুধু ন্যাটোর সদস্য হয়ে রাশিয়ার এস-৪০০ কেনা নিয়ে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ভয়ে ছিলেন। সত্য বলতে কি, তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়লেও এখনো নিজের সিদ্ধান্ত ও কৌশল একাকী বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা হয় নি এবং এ জন্য চলার পথে সব সময় সব কথা রাখাও তার পক্ষে সম্ভব না।

আরো চরম সত্য কথা হল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বারবার পরিবর্তন হয়। তবে, আমার মনে হয় এরদোগান এ ক্ষেত্রে একজন পাকা খেলোয়াড়। তিনি একজন যুক্তিসঙ্গত ইসলামপন্থী তবে আবেগী না। একবার ওবামা এরদোগান সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এক নতুন ধরণের মুসলিম নেতা; যিনি নীতি ও কাজে অটল”। ইস্তাম্বুলের  মেয়র থাকার সময় একটি ইসলামি কবিতা পড়ার কারণে তার মেয়রের পদ গিয়েছিল। শোককে শক্তিতে রুপান্তর করে তিনি ‘ডিপলোপমেন্ট এ্যান্ড জাস্টিস’ পার্টি গঠন করেন ২০০১ সালে । আস্তে আস্তে বিরোধীরা তার জনপ্রিয়তার কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এসবই তো এখন ইতিহাস। তুর্কি রাজনীতিতে সেনাবাহিনী বরাবর একটা ফ্যাক্টর ছিল এবং নিজেদেরকে তারা কামাল আতাতুর্কের দেয়া ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষাকারী মনে করত। এই জন্য বিভিন্ন অজুহাতে সেনাবাহিনী ১৯৬০, ১৯৭১, ১৯৮০  ও ১৯৯৭ সালে সফল ক্যু করেছিলেন। একটু ভুল হলেই ২০১৬ সালে ‘গুলেন মুভমেন্ট’ ও সেনাবাহিনীর আঁতাতের কাছে এরদোগানকে মিশরের মুরসির ভাগ্য বরণ করতে হতো।কিন্তু, এরদোগান দক্ষতার সাথে তাদেরকে নিউট্রিলাইজ করতে পেরেছেন।

সত্য কথা বলতে কি, তুরস্কের অর্থনীতির অবস্থা পুর্বে ভালো ছিল না। এরদোগান ক্ষমতায় আসার পর থেকে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।২০০২ সালের পর স্থিরতা, উন্নতির দিকে ধাবিত হতে থাকে তুরস্ক। গত ১১ বছর ধরে ৫% হারে অর্থনীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই ২৩০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ২০১৩ সালের মধ্যে ৮২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। এক সময় ৪.৩০ ডলারে নিচে দৈনিক আয় ৩০% লোকের ছিল ;কিন্তু এক দশকে তা কমে হয় ২.৯% ।  এর প্রভাবে দেশে নতুন মিডল ক্লাস সৃষ্টি হয়ে অর্থনীতি আরো চাঙ্গা হয়।  করোনা ভাইরাস ও ভিন্নমুখী কিছু নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ২০২০ সালে অর্থনীতি ছিল নিম্নমুখী এবং এ-র সাথে যোগ হয় তুরস্কের  কূটনীতিক অভিযানের বিরূপ কিছু প্রতিফল। তারপরেও, সবকিছু ভালো-ই চলছে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে তুরস্কের জিডিপি ছিল ৭২০.১০ বিলিয়ন ডলার।

২০২১ সালে তুরস্কের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ আছে । বাইডেন ক্ষমতা নেওয়ার পূর্বে সতর্ক করেছেন এরদোগান একজন ‘নিপীড়ক’ প্রয়োজনবোধে বিরোধী শক্তির মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হবে। বাইডেন প্রশাসন সামরিক বলয়ে ‘ব্রেট ম্যকগ্রাক’কে আবারো ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন যিনি আইসিস লড়াইয়ে পিকেকে এবং ওয়াইপিজি যোদ্ধাদের সাথে গভীর সম্পর্ক রেখে চলেছেন। এ-ই বিষয়টি তুরস্কের গলার কাঁটা। নতুন খবর হল,আফগানিস্তানে বিমান বন্দর  রক্ষার জন্য তুরস্কের সেনা থেকে যাচ্ছে। সুতরাং আমেরিকার সাথে ভাঙ্গা সম্পর্ক জোড়া লাগা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।সুতরাং, তা হবে এরদোগানের জন্য আর একটা অর্জন।

গ্রীসে সাথে ভূমধ্যসাগরে জলজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য বিতর্ক ও শক্তি প্রদর্শন তুরস্ককে বড় মাত্রার নিষেধাজ্ঞায় পতিত করার হুমকিতে ফেলেছিল; অনেকটা জার্মানির সহায়তায় ড্রিল করা ‘ফেইথ’ জাহাজকে সরিয়ে নিয়ে সেই যাত্রায় তবে মুক্তি। তবে আলোচনার মাধ্যমে সম্পদের উত্তোলন তুর্কি রাজি হলেও, গ্রিসের অস্ত্র বৃদ্ধির প্রতিযোগিতার বিরোধী তিনি।  আবার,এ-ই সমস্যায় ঘৃতাহুতি দিতে যোগ হয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, ইসরাইল ও পুর্বে বিক্ষুব্ধ ফ্রান্স । আবস্থা দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় তুরস্ক বিষয়টা ভালো করে বুঝতে পেরে, ইসরাইল ও মিশরের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে হাঁটছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেবার আন্তরিকতার ব্যাপারে তুরস্কের ইচ্ছা আছে; কিন্তু বিভিন্ন শর্তে আরোপে নাজেহাল তুরস্ক নিজেদের মূল্যবোধের বাইরে গিয়ে মনে হয় না ধর্ণা দিবে । কিন্তু, তবুও আশা এখনো জিইয়ে রাখতে তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ের পছন্দ।

সামরিক দিক থেকে ইরাক, সিরিয়া, সোমালিয়া, আলজেরিয়ায় এবং লিবিয়ায় সরব উপস্থিতি আছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে তথা কাতারের রাজধানী দোহায় তাদের ঘাঁটি  ‘তারিখ বিন জিয়াদ’  দেশটিকে একসময় অবরোধ ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে। কিছু মুসলিম দেশসহ গোটা বিশ্বের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছেন। তুরস্কের  ‘বায়রাকতার টিবিটু’ ড্রোনের চাহিদা ইউরোপেও বেড়ে গেছে। নাগারনো-কারবাক যুদ্ধ এরদোগানকে আরো শক্তিশালী করেছে। ।অনেকে বলছেন দেশের ভিতরে ইস্তাম্বুল খাল খুঁড়ে তিনি শুধু সামদ্রিক জাহাজের চাপ কমানো ও আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্য করেন নি; এর পিছনে তিনি  প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ছক এঁকেছেন।

মোদ্দাকথা,  অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক ও কূটনীতিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে তুরস্ক এক নব্য ও ভূরাজনৈতিক শক্তির আধিকারী হবে।

লেখক
প্রভাষক, ইংরেজি
কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট স্যাপার কলেজ, নাটোর।

2 responses to “এরদোগানের ভবিষ্যৎ!”

  1. … [Trackback]

    […] There you will find 50377 more Info to that Topic: doinikdak.com/news/41053 […]

  2. 토렌트 says:

    … [Trackback]

    […] Read More to that Topic: doinikdak.com/news/41053 […]

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x