ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৯ মে ২০২২, ১১:২৭ পূর্বাহ্ন
কয়েক কোটি টাকা মূল্যের নিউ মার্কেট মোড়ের আলোচিত সরকারি জমির মামলার রায় ২০ সেপ্টেম্বর
মো. মুনসুর রহমান
৯ বছর পরে সাতক্ষীরার নিউ মার্কেট মোড়ের আলোচিত কয়েক কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমির মামলায় আগামী ২০ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত। জেলার আলোচিত এই ঘটনায় বাদী এবং আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে এই রায় ঘোষণার নির্ধারিত দিন ধার্য করেছেন আদালত। সদর সহকারী জজ আদালত এর বিচারক নাসিরউদ্দিন ফারাজী ওই দিন এ রায় ঘোষণা করবেন বলে জানা যায়।জানা গেছে, সরকারি ওই সম্পত্তি প্রাপ্তির জন্য জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদর সহকারী (ভূমি) কমিশনার ও সদর ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে বিবাদী করে সদর সহকারী জজ আদালতে ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শহরের মৃত. ছোবহান খানের ছেলে জোট সরকারের আমলে সাতক্ষীরার সবচাইতে ক্ষমতাধর যুবদল নেতা নাসিম ফারুক খান মিঠু মামলা দাখিল করেন। যার নং-৫৮/১১।
মামলার নথি ও ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, পলাশপোল মৌজার ১০৮৭ খতিয়ানের ১১৪৬৬ দাগের .৫ শতক জমির রেকর্ডীয় মালিক উপন্দ্রেনাথ দত্ত। তিনি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় স্ব-পরিবারে ভারতে চলে যান এবং আর কখনো প্রত্যাবর্তন করেননি। তৎপ্রেক্ষিতে সঠিক বিচার তৎকালীন আইন মতে সম্পত্তিটি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভুলক্রমে তা হয়নি। এস, এ এন্ড টি এ্যাক্টের ৯২-ক ধারামতে উক্ত সম্পত্তি পরিত্যক্ত হিসেবে বিবিধ মামলামূলে খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিলো। কিন্তু তা না হয়ে ১৯৬৯-৭০ সালে ৪৯০৩ নং সার্টিফিকেট কেসের নামে একটি ভূয়া কেসের রেফারেন্সে জমিটি অন্যায্যভাবে রসুলপুরের মৃত. আব্দুল জব্বার খানের মেয়ে ছাবেরা খানম দখলের পায়তারা করেন।

মামলার নথি ও ঘটনার বিবরণে আরও জানা গেছে, রহস্যময়ভাবে ছাবেরা খানম ১৯৭৬-৭৭ সালে ঐ সম্পত্তি নীলামে ক্রয় করেন। পরবর্তীকালে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করেনি। বরং ২০০৫/২০০৬ সালের দিকে বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করেন এবং ছাবেরা খানম হতে সরকারি ঐ সম্পত্তি নাসিম ফারুক খান মিঠু ক্রয় করেন। এরপরে ঐ সম্পত্তি নিজ অনুকূলে রাখতে ইতিপূর্বে ২ টি মামলা দায়ের করেন। যার নং- ৯৮/২০০৭, ১৪৯/০৯। এরমধ্যে ২টির আদেশ সরকারের পক্ষে। এরপরে ঐ রায়ের বিপরীতে ২বার আফিলও করেন মিঠু খান। তবে সেই রায়ও সরকারের পক্ষে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। আরও বাকি ৫৮/১১ মামলার রায় আগামী ২০ সেপ্টেম্বর। তবে ঐ রায় কোটি টাকা মূল্যে বেচাকেনা হতে পারে বলে সংশয় রয়েছে।

এ বিষয়ে ২০০৭ সালের ৯ আগস্ট নিঃঅঃ/সাতঃসদর/৫-২/২০০৭ নম্বর স্মারকে তৎকালীন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম আব্দুল করিম তার এক লিখিত প্রতিবেদনে পলাশপোল মৌজার এস এ ১০৮৭ নং খতিয়ানের ১১৪৬৬ দাগের ০.৫ শতক সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার পূর্বক প্রয়োজনীয় সদয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাতক্ষীরাকে অনুরোধ করেন। ঐ প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন তর্কিত সম্পত্তিটি বর্তমান মাঠ জরীপ রেকর্ডে ১/১ নং খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু প্রভাবশালী বিবাদী পক্ষে প্রভাবের ফলে ৩০ ধারায় উভয় পক্ষের শুনানী অন্তে পরে বিবাদী নাসিম ফারুক খান মিঠুর নামে রেকর্ড করা হয় মর্মে জানা যায়। এমতাবস্থায় সার্বিক বিবেচনান্তে তর্কিত সম্পত্তিতে সরকারী স্বার্থ আছে বিধায় তা রক্ষার্থে তথাকথিত ৪৯০৩/৬৯-৭০ নীলাম কেসের অস্তিত্ব না থাকয় ইহার রেফারেন্সে গৃহীত নীলাম কার্যক্রম তথা নীলাম ক্রয়কে অবৈধ বা বাতিল ঘোষণা করা, উক্ত সরকারী সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসাবে ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং ৭০০২ ডিপি খতিয়ান বাতিল করার জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসারকে নির্দেশ প্রদান বা অনুরোধ করা, উপজেলা ভূমি অফিস, সাতক্ষীরা সদরের তথাকথিত ২৮৩/১৯৭৬-৭৭ নং নাম পত্তন মামলার আদেশ এবং পরবর্তীতে দায়েরকৃত মিস ২৪/০৬-০৭ নং মামলার আদেশ বাতিল করার প্রয়োজনীয় ব্যস্থা গ্রহণ করে রেকর্ড সংশোধনা করা এবং সরকারী স্বার্থ বিরোধী পুরো প্রক্রিয়ার সাথে যুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ঘটনাটি সম্পর্কে সরকারি কৌশুলী (জিপি) শম্ভু নাথ সিংহ জানান, ৯ বছর পরে সাতক্ষীরার নিউ মার্কেট মোড়ের আলোচিত কয়েক কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমির মামলায় আগামী ২০ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার দিন। ইতিপূর্বের ৪টি আদেশ সরকারের অনুকূলে দেখা যায়। সেইসব নথি ও কাগজ পত্রাদি পর্যালোচনা করলে অবশ্যই রায় সরকারের অনুলে হওয়ার সম্ভবনা বিদ্যমান।

বিষয়টি সম্পর্কে ইকো ইলেকট্রনিক্স এর মালিক আনিসুল হক (আনিস) জানান, এই সম্পত্তির মালিক উপেন্দ্রনাথ। তিনি পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ভারতে চলে যান। পরে আর ফিরে আসেননি। এরপরে ঐ জমি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেসময় এই জায়গা ফাঁকা ছিল। তখন সরকারি ঐ সম্পত্তিতে একটি দোকান করেছিলাম। সেখানে প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। এরপরে ঐ সম্পত্তি ইজারা নিতে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদনও করেছিলাম। তবে কয়েক বছর পূর্বে ঐ সম্পত্তির দাবীদার ভূয়া মালিকের ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে রেজিষ্ট্রি দলিলমূলে শহরের মৃত. ছোবহান খানের ছেলে নাসিম ফারুক খান মিঠু ক্রয় করে দখলে নিতে ব্যর্থ হয়ে সদর সহকারী জজ আদালতে ৫৮/১১ নং মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার রায় আগামী ২০ সেপ্টেম্বর। ইতিপূর্বে কয়েকটি মামলা করেছিল। তবে প্রত্যেকটি মামলার রায় সরকারের পক্ষে ছিল। সেজন্য সার্বিক বিষয়াদি পর্যলোচনা পূর্বক সঠিক রায় ঘোষণার আসা সংশ্লিষ্ট বিচারকের কাছে প্রত্যাশা করছি আমরা।

স্থানীয় ব্যক্তি সামছুল হুদাসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, বর্তমান সরকারের বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। তবে কিছু কিছু বিভাগের কর্মকর্তা ও আদালতের বিচারকের অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। সাতক্ষীরার প্রাণ নিউ মার্কেট মোড়। এই মোড়ের সরকারি সম্পত্তি প্রভাব খাটিয়ে ইতিপূর্বে মিঠু খান নিজ নামে নামপত্তন করেন বলে আমরা জানি। সেই প্রভাব খাটিয়ে সরকারের পক্ষের রায় মিঠু যেন নিজের অনুকূলে নিতে না পারে সেজন্য সিনিয়র দায়রা ও জেলা জজ, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

এ ব্যাপারে জানতে মামলার বাদী নাসিম ফারুক খান মিঠু জানান, ইনজেনশনের মামলা করেছিলাম। ইতিপূর্বে জজ কোর্ট ও হাইকোর্টের ২ টি পৃথক পৃথক রায় আমার অনুকূলে দিলে সরকারপক্ষ আপিল করেন। পরবর্তীতে আবারও জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদর সহকারী (ভূমি) কমিশনার ও সদর ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে বিবাদী করে সদর সহকারী জজ আদালতে ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ইনজেনশনের মামলা করেছিলাম। সেই মামলার রায় আগামী ২০ সেপ্টেম্বর। আশা করছি, আদালতের বিচারক যৌক্তিক রায় প্রদান করবেন। এ প্রসঙ্গে মামলার বিবাদী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জানান, অফিস থেকে এখনই বাসায় এসেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনি মামলার নম্বরটি বলেন। বিষয়টি দেখবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x