ঢাকা, বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১, ১২:২৫ অপরাহ্ন
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ কারখানা ট্রাজেডিঃ নিহত বেড়ে ৫২
দৈনিক ডাক অনলাইন ডেস্ক

আগুন জ্বলছে কারখানায়। তখনো ভেতরে আটকা শ্রমিকেরা। বাইরে উদ্বিগ্ন স্বজনদের আহাজারি। গতকাল সকাল ৯টায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হাশেম ফুডস লিমিটেডের কারখানার সামনে।

ছয়তলা বিশাল কারখানা ভবন থেকে বের হওয়ার পথ (সিঁড়ি) মাত্র দুটি। এর মধ্যে ভবনের সামনের পথটি ব্যবহারের উপায় ছিল না। কারণ, আগুন এদিক থেকেই ছড়িয়েছে। ভবনের পেছনের দিকের পথ দিয়েও কেউ বের হতে পারছিলেন না তীব্র তাপ ও ধোঁয়ার কারণে। ফলে শ্রমিকেরা ছুটতে থাকেন ছাদের দিকে। কিন্তু সবাই ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। এর আগেই মৃত্যু এসে হাজির হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হাসেম ফুডস লিমিটেড কারখানা ভবনের ভেতর থেকে গতকাল শুক্রবার দুপুরের দিকে সাদা ব্যাগে করে একে একে ৪৯টি পোড়া মরদেহ বের করে আনেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বেশির ভাগ মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে তাঁদের আর চেনার উপায় নেই। যে কারণে একটি লাশও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা যায়নি। লাশ রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য মৃতদেহগুলোর নমুনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার পর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, ডিএনএ বিশ্লেষণ করে পরিচয় নিশ্চিত করতে ২১ থেকে ৩০ দিন সময় লাগতে পারে।

কারখানা ভবনে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মনির হোসেন বলেন, ভবন থেকে যে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই পাওয়া গেছে চতুর্থ তলায়। ভবনের চতুর্থ তলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে জানালার ধারে লাশগুলো পড়ে ছিল। লাশগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে কে নারী, কে পুরুষ তা চেনার উপায় নেই।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ওই কারখানা ভবনে আগুন লাগে। ওই দিনই ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে ৩ জন মারা যান। সব মিলিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ জন নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে।

এর আগে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের তল্লা এলাকায় মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হন।

আগুনে পুড়ে যেসব শ্রমিক মারা গেছেন, তাঁরা সবাই বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় কাজে আসেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, সকালের পালায় আসা শ্রমিকদের ছুটি হওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যা ৬টায়। ছুটির ঘণ্টাখানেক আগে বিকেল ৫টার পর ভবনের নিচতলায় আগুন লাগে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নিচতলায় আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে প্রচণ্ড ধোঁয়া তৈরি হয় এবং দ্বিতীয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানার আহত শ্রমিক সবুজ আলম বলেন, তিনি কাজ করছিলেন দ্বিতীয় তলায়। হঠাৎ ভবনের ভেতর ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পান। তাঁর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। প্রথম ভবনের সামনের সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। পরে দৌড়ে পেছন দিকের সিঁড়ি দিয়ে ধোঁয়ার মধ্যেই নেমে আসতে সক্ষম হন।

ছয়তলা ভবনে নিচতলায় কার্টন তৈরির কারখানা। দুই তলায় টোস্ট (বিস্কুট), তিনতলায় জুসসহ বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয় উৎপাদিত হতো। আর চারতলায় চকলেট ও লাচ্ছা সেমাই তৈরি হতো। পঞ্চম তলায় ভোজ্যতেল রাখা ছিল। আর ছয়তলায় ছিল কার্টনের গুদামঘর। আগুনের সূত্রপাত যখন হয়, তখন কারখানায় প্রায় ১৮০ জন শ্রমিক কাজে ছিলেন।

নিচতলা থেকে আগুন সব কটি তলায় মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান হাসেম ফুডের প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, আগুন লাগার খবর পেয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে প্রথমে নিচতলা ও দোতলায় আগুন দেখতে পান।

বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট টানা প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ আনতে সক্ষম হয়।

আগুন নিয়ন্ত্রণে এত সময় লাগার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মনির হোসেন বলেন, ভোজ্যতেলসহ পুরো ভবনে নানা ধরনের রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে। এসব দাহ্য বস্তুর কারণে আগুন নেভাতে অনেক সময় লেগেছে।

আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, ভবনে নিচতলায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা গ্যাস বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, সেটি তদন্তের পর সুনিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে।

আগুনের ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর পৃথক তিনটি কমিটি গঠন করেছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর। তিনি রূপগঞ্জের সাংসদ। এ ছাড়া ঘটনাস্থল ঘুরে গেছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যাদের অবহেলা খুঁজে পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা জানিয়েছে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, নিহতদের পাশাপাশি গুরুতর আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেবেন।

১৭ বছর বয়সী কিশোর রাকিব হোসেনের ছবি হাতে নিয়ে গতকাল সকালে কারখানার সামনে অপেক্ষায় ছিলেন বাবা কবির হোসেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন থানায়। এক বছর ধরে রাকিব এই কারখানায় কাজ করে। আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর থেকে তিনি ছেলের মুঠোফোনে বারবার কল দিয়ে চলেছেন। কিন্তু মুঠোফোন বন্ধ পাচ্ছেন।

বাবা কবির হোসেন বলেন, ‘কেউ আমার ছেলের খোঁজ দিতে পারছে না।’

কারখানার সামনে অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে নিখোঁজ ৯ শ্রমিকের তথ্য পেয়েছেন তিনজন প্রতিবেদক। যাদের বয়স ১৮-এর নিচে।

অবশ্য হাসেম ফুডের ব্যবস্থাপক (প্রশাসক) কাজী রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তাঁদের কারখানায় কোনো কিশোর শ্রমিক কাজ করে না। স্বজনেরা সঠিক তথ্য দিচ্ছেন না।

পুলিশের করা নিখোঁজ শ্রমিকদের তালিকা ও কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, নিখোঁজ শ্রমিকদের তালিকায় ৪৮ জনের নাম রয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগের বাড়ি কিশোরগঞ্জ ও ভোলায়। এ ছাড়া নেত্রকোনা, গাইবান্ধা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, যাঁদের লাশ মর্গে রাখা হয়েছে, তাঁদের সবাই নিখোঁজ।

বোন ইশরাত জাহানের ছবি হাতে নিয়ে কারখানার সামনে দিনভর ঘুরে বেড়ানো কিশোরগঞ্জের ঝুমা আক্তার বলেন, ‘আমার বোনকে খুঁজে পাচ্ছি না। মানুষজন বলছেন, লাশ চেনার কোনো উপায় নেই।’

লাশের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ টেস্টসহ অন্যান্য পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল ইসলাম।

এদিকে নিখোঁজ শ্রমিকদের খোঁজে গতকাল সকাল থেকে কারখানার সামনে অবস্থান নেন স্বজন ও অন্য শ্রমিকেরা। তাঁরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কয়েক দফা পুলিশের সঙ্গে স্বজন ও শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ওই কারখানার আনসার ক্যাম্পে হামলা চালান। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া এই কারখানা সজীব গ্রুপ অব কোম্পানিজের মালিকানাধীন। সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম। তিনি ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে নির্বাচন না করার কথা জানান দলকে। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন। কিন্তু দল তাঁকে আর মনোনয়ন দেয়নি।

কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা এবং শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেওয়াসহ অন্যান্য বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল দিনভর বেশ কয়েক দফা মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। পরে ফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি। তবে ডেইলি স্টার অনলাইনকে তিনি বলেছেন, ‘আমি তো আর যেয়ে আগুন লাগিয়ে দিইনি। অথবা আমার কোনো ম্যানেজার আগুন লাগায়নি। শ্রমিকদের অবহেলার কারণেও আগুন লাগতে পারে।’

কারখানা ভবনে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা তাঁদের চোখে পড়েনি। ছয়তলার এত বড় ভবনের মাত্র দুটি সিঁড়ি, তা-ও প্রশস্ত নয়। ভবনে যদি অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ভালো থাকত, তাহলে এত প্রাণহানি ঘটার কথা নয়। ভবনের আয়তন অনুযায়ী চার থেকে পাঁচটি সিঁড়ি থাকার দরকার ছিল। আগুনের তাপ ও প্রচণ্ড ধোঁয়ায় আটকে পড়া শ্রমিকেরা মারা গেছেন।

হাসেম ফুডের প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন দাবি করেন, ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ছিল। সবই আগুনে পুড়ে গেছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক ফখর উদ্দিন বলেন, ‘পুরো ভবন ঘুরে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা কিন্তু আমরা খুঁজে পাইনি।’

One response to “নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ কারখানা ট্রাজেডিঃ নিহত বেড়ে ৫২”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x