ভাস্কর সরকার (রাবি প্রতিনিধি): সাম্য-মানবতার কবি, প্রেমের কবি, বিদ্রোহের তূর্যবাদক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২২তম জন্মবার্ষিকীতে অন্তরস্থল হতে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি৷ শিল্পী জীবনের সীমিত পরিসরে নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার মূল্যায়ন সময়সাপেক্ষ৷ তাই তাঁকে নিয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস৷
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। বাবার নাম কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহেদা খাতুন। দরিদ্র পরিবারে জন্মের পর দুঃখ-দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। তাঁর ডাকনাম ছিল দুখু মিয়া। বাবার অকালমৃত্যুতে পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিনি শিশু বয়সেই মক্তবে শিক্ষকতা, হাজি পালোয়ানের মাজারে খাদেম, মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। তবে নিজের দুঃখ নিয়ে নয়, তিনি জাতির দুঃখ-ক্লেশ, দৈন্য-লজ্জা ঘোচানোর জন্য ভাবতেন সব সময়।
অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদে প্রবলভাবে আস্থাশীল এই মহৎ কবির আরাধ্য ছিল সত্য শিব ও সুন্দর৷ প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে তিনি বলেছেন, ‘সুন্দরের ধ্যান, তার স্তব গানই আমার উপাসনা, আমার ধর্ম৷ যে কূলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব৷ আমি তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি৷'(প্রতিভাষণ: নজরুল ১৯২৯)
সুনির্দিষ্ট কোনো ধর্ম, দর্শন কিংবা জীবন চর্যায় তিনি দীর্ঘকাল স্থির থাকতে পারেননি; তবুও সকল ধর্মের সার্বজনীন মূল্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় আস্থা৷ আর এই আস্থা তাঁকে হিন্দু কিংবা মুসলমানের কবি না করে, করেছে বাংলা ও বাঙালির কবি৷ তাই তো মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামে এবং পরম সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি সাধনায় তাঁর কবিতা ও গান বাঙালিকে যোগায় অনিঃশেষ প্রেরণা ৷

নজরুলের সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক রূপ : ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’। মানুষ যদি অন্তরাত্মাকে না চেনে, অন্য ধর্মকে সম্মান করতে না শেখে, নিজেকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ প্রমাণের জন্য ব্যস্ত থাকে, তাহলে সমাজে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা গড়ে উঠবে না। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। কিন্তু আজকের বাংলার বাস্তবতা উল্টো ‘সবার উপরে ধর্ম সত্য মানুষ সেখানে নাই’! নজরুল এসবের অবসান চেয়েছেন। গড়তে চেয়েছেন একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক-সমাজ; শোষণমুক্ত বিশ্ব। নজরুল তাঁর চারটি সন্তানের নাম রেখেছিলেন হিন্দু মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য ও পুরাণের আলোকে। তাঁর সন্তানদের নাম যথাক্রমে কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ। অসাম্প্রদায়িক নিদর্শন আর কী হতে পারে! মসজিদে গজল আর ইসলামি সংগীত আর মন্দিরে শ্যামাসঙ্গীত; তার সমানভাবে জনপ্রিয়। বিশ্বের শীর্ষ দু’ধর্মেও অনুসারীদের কাছে ধর্মগ্রন্থের পরেই প্রিয় সংগীত! ভাবা যায়! বিশ্বের আর কোনো সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে বা আইডলের কাছে এমন হয়নি। ইসলামি সংগীত, হামদ ও নাতগুলো চমৎকার। হিন্দুদের জন্য রচিত শ্যামাসঙ্গীতও দারুণ জনপ্রিয়। কবি নজরুল ভাবতেন মুক্তির জন্য ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় স্বাধীনতার দাবি আগেই করেছিলেন। ভারতবাসীকে স্বাধীনতার দাবি করতে উৎসাহিত করেন গানে, এভাবে- ‘আমরা জানি সোজা কথা, পূর্ণ স্বাধীন করব দেশ।/এই দুলালাম বিজয়-নিশান, মরতে আছি-মরব শেষ। ‘ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায়, ‘আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।/দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,/ভূ-ভারত আজ কসাইখানা আসবি কখন সর্বনাশী?’

‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছো জুয়া’। মানুষের কল্যাণে ধর্ম সৃষ্টি। কিন্তু ধর্মকে ব্যবহার করে শোষণ-ত্রাসন সৃষ্টি করা হয় বলে কবি নজরুল মনে করতেন। কার্ল মার্ক্সের ‘আফিম তত্ত্ব’র মতো নজরুল বললেন, ‘কাটায় উঠেছি ধর্ম-আফিম নেশা,/ধ্বংস করেছি ধর্ম-যাজকী পেশা,/ভাঙি ‘মন্দির’, ভাঙি মসজিদ,/ভাঙিয়া গীর্জা গাহি সঙ্গীত-/এক মানবের এক রক্ত মেশা’-(বিংশ শতাব্দী, প্রলয় শিখা)। যেন সত্যেন্দ্রনাথের ‘কালো আর ধলা বাহিরে কেবল, ভেতরে সবার সমান রাঙা’র মতো। আর একটা কবিতাংশের কথা উল্লেখ করাই যায়। ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,/আমার ক্ষুধার অন্ন তা বলে বন্ধ করোনি প্রভু।/তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,/মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি।’ সাম্যবাদী কাব্যের ‘মানুষ’ কবিতায় স্রষ্টার প্রতি ‘ভুখা মুসাফির’র আত্মকথন। কবি নজরুলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অত্র অঞ্চলের প্রধান দুটি ধর্মের অনাচার-অসাম্যের প্রতি সমান আঘাত হেনেছেন। মুসলমান ও হিন্দু ধর্মের তথাকথিতদের ওপর আক্রোশ ঝরে পড়েছে কবিতার পরতে পরতে। তাঁর কবিতায় ‘মানুষ’ই মূখ্য উপজীব্য। অসাম্প্রদায়িক এমন সাহিত্যিক বিশ্বে বিরলই।

বাংলা কবিতায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে এই কবি বাঙালির চৈতন্যে প্রথম বড় ধরনের ধাক্কা দিলেন; তিনি ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। লিখলেন হিন্দু-মুসলমান মিলনের বহু কবিতা ও গান। ‘অসহায় জাতি ডুবিছে মরিয়া, জানে না সন্তরণ/কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।/হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।’(কাণ্ডারী হুঁশিয়ার)
হিন্দু-মুসলমান মিলনের কথা কবীর, নানক থেকে লালন সাঁই পর্যন্ত অনেকে বলেছেন৷ কিন্তু নজরুলের মতো জীবনে মননে অমন গভীরভাবে কেউ কি আর বলতে পেরেছে? বাংলার জাতীয় কবি নজরুলের মত সাম্প্রদায়িকতা ও ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেনি কেউ৷
Leave a Reply