ঢাকা,রবিবার ০৪ জুলাই ২০২১, ০২:৩৫ অপরাহ্ন
নাম না জানা এক অচিন গাছের কথা!
দৈনিক ডাক অনলাইন ডেস্ক

যাহা সর্ম্পকে কোন ধারনা না থাকে সেটাই অচেনা, অজানা বা অচিন। তবে সবাই সব কিছু চেনবে এটাও যেমন স্বাভাবিক না তেমনি কোন জিনিসের নাম থাকবে না এটাও স্বাভাবিক না। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মর্ডান এ যুগে একটি গাছের নাম জানা নেই এটা কেমন কথা। বৃক্ষ তোর নাম কি? বৃক্ষ বলে ফলে পরিচয়। ফুলফল সবই আছে, তবুও পরিচয় জানা নেই।

স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে গাছটির অজানা গা-শিউরে উঠার মতো কাহিনী। স্থানীয়রা বলেন, গাছটির বয়স হবে প্রায় ৪০০ বছর। বিট্রিশ আমলে এখানে গভীর জঙ্গল ছিলো। সেখানে ভয়ে মানুষ উঁকিও দিতোনা। পাকিস্তান আমলে ৬২ সালের দিকেঅজানা এক সাধু আচমকা গাছটির নিচে আশ্রয় নেয়। তার কানেছিলো দুল। মাথায় ঝাকড়া চুল। পায়েঘু ঙুর। পড়নে থাকতো পাটের চট। বাকপ্রতিবন্ধী এ সাধু ক্ষিধে পেলে অচিন গাছেরপাতা চিবিয়ে খেতো। তারপাশে সবসময় জলন্ত আগুনের কুন্ডলী থাকতো। আর বাঁশের তৈরী হুক্কা দিয়ে হুক্কা খেতো। ধীরে ধীরে মানুষের যাতায়াত শুরু হয়।

এক সময় মানুষ সাধুর কাছে বিভিন্ন রোগনিরাময়ের জন্য পানিপড়া নিতো। উপকার পেয়ে অনেকে নানা কিছু মানত করতো। তার সঙ্গে সবসময় বালতি থাকতো। তাই ওই সময় তাকে সবাইবালতি সাধু বলে চিনতো। বৃদ্ধরা আরো জানান, অচিনগাছের নিচে বিশালআকৃতির সাপের বসবাস ছিলো। একদিন গর্ত থেকে সাপ বের হয়ে মানত করা মুরগীধরে গর্তে ঢুকার চেষ্টা করে। এসময় সাধু পাগলা সাপের লেজে ধরে টানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। একবার মহররম মাসে আগুনের কুন্ডলী থেকে তার পরনের চটে আগুন ধরে শরীরের বিভিন্ন স্থান ঝলসে যায়। ক্ষত অবস্থায় তার দেখভাল করতো স্থানীয় আমেনা’র মা। প্রায় আটদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মহররম মাসের ১৪ তারিখ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।তার মৃত্যুর জানাযা পড়ান স্থানীয় প্রয়াত কমুরউদ্দিন কাজী।

জাঙ্গীর সুন্নী মাদ্রাসার মাওলানা ফাইজুদ্দিন বলেন, বালতি সাধু ইরাকের বাগদাদ শহরের এক পীরের শিষ্য। তাই তাকে নুরাবাগদাদী বলে ডাকতো অনেকে। সত্তোর বছর বয়সী হুমায়ুন মাষ্টার। এলাকার লোকেরকাছে সম্মানীয়। তিনি বলেন, অচিনদ্বীপটা ওয়াকফসম্পত্তি। অচিনগাছের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার দাদা ডেঙগুরি ভূইয়া প্রায় ১৩০ বছর বেঁচে গেছেন।বাবা সোলায়মানভূইয়া বেঁচে গেছেন ৯০ বছর। তাদের মুখে ছোটকালে শুনেছি এ অচিন গাছের গল্প।
তিনি বলেন,গাছটি অনেক পুরনো। নুরাবাগদাদের আগমন না হলে অচিন গাছ ও অচিন দ্বীপের সৃষ্টি হতোনা। উদ্ভিদ বিভাগের লোকজন ও গাছটির পরিচয় চিহ্নিত করতে পারেনি। ফলে এলাকাবাসী গাছটিকে অচিনগাছ বলেই চেনে। আর জায়গাটিকে চেনে অচিনতলা হিসাবে।
তিনি আরো বলেন, গাছটি দেখতে আশপাশ সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসে। মানত করে। আগে কয়েকবার নুরাবাগদাদীর নামে মেলা বসতো। ঝামেলার কারণে এখন আর এইটা হয়না। মৃত মোতালিব মাষ্টারের বরাত দিয়ে হুমায়ুন মাষ্টার আরো বলেন, নুরাবাগদাদী মারা যাওয়ার ঠিক দেড় বছর পর তিনি পার্শ্ববর্তী একটি মেলায় যান। সেখানে গিয়ে তিনি কথা বলতে এগিয়ে যান। গিয়ে দেখেন তৎক্ষণাত নুরাবাগদাদী হাওয়া। বহু খোঁজাখোজির পরও তার আর দেখা মেলেনি।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, অচিনদ্বীপের ওয়াকফসম্পত্তি দখলে নিতে একটি চক্র মরিয়া। দীর্ঘদিনধরে এ চক্রটি নানাভাবে পাঁয়তারা চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি অযতেœ অবহেলায় রয়েছে অচিনগাছ ও নুরাবাগদাদীর মাজারটি। কথিত রয়েছে, অচিন বৃক্ষটির ঝড়েপড়া পাতাও কেউ কুড়িয়ে নেয়না। বছরেও দু’তিনবার পাতা ঝরে। আবার ঝড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন পাতায় পল্লবিত হয়ে ওঠে শাখা-প্রশাখা। গাছেরডাল কিংবা পাতা অকারণে ছিঁড়লে নাকি পেটে ব্যথা হয়। তবে মনোবাসনা কিংবা রোগবালাইয়ের জন্য কেউ যদি পাতা ছিঁড়ে চিবিয়ে খায় সেক্ষেত্রে কোন সমস্যা হয়না। উল্টো রোগ ভাল হয়ে যায়। বৃক্ষটির পাতা দেখতে অনেকটা বটপাতার মতো। তবে ছোট আকারের ফল হয়। দেখতে কিসমিসের মতো।

মর্ডান যুগে ৪শ’ বছরের পুরনো একটি গাছের নাম জানা নেই। তাই গাছটিকে অচিন বৃক্ষ নামে ডাকে সবাই। নারায়নগঞ্জের জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গীর এর টেঙ্গর এলাকায় ৪’শ বছরের পুরনো একটি বৃক্ষ এখনো অচিন বৃক্ষই রয়ে গেল। এলাকার প্রবীন ব্যক্তিরা জানান, কুদুর মার্কেটের একশগজ উত্তরে টেঙ্গর এলাকায় অবস্থিত বিশাল আকৃতির এই গাছটির নাম এখনো কেউ শনাক্ত করতে পারেননি। নাম না জানার দরুন এলাকাবাসী এটিকে “অচিন বৃক্ষ” বলে ডেকে আসছে। আফতাব উদ্দিন নামে একজন এলাকাবাসী বলেন, অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক বৈজ্ঞানিক সরেজমিনে এসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও এই বিরল প্রজাতির গাছের নাম পরিচয় উদ্ধার করতে পারেননি।
মুড়াপাড়া ডিগ্রী কলেজের প্রফেসর নূরুজ্জামান ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর মোঃ জাহাঙ্গীর আলম এটিকে ডোমার গোত্রের গাছ বলে অভিহিত করেন।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর আলী হোসেন বলেন, আজ অবদি গাছটির নির্দিষ্ট কোন নাম জানা যায়নি। প্রফেসর নূরুজ্জামান জানান, গাছটির নাম নির্দিষ্ট করা এখনো সম্ভব হয়ে উঠেনি, তবে এর ফুল ও ফল বট গাছের মতো, যা পাখিদের খুবই প্রিয় খাবার।

এলাকাবাসীদের সহযোগীতায় খাদেম রুহুল আমীন গাছটির চারপাশসহ নুরা পাগলার কবর বাঁধায়ের পর থেকে এখানে বিভিন্ন এলাকা হতে লোকজন আসতে শুরু করে। এখন এলাকাটি অচিন তলা নামে অধিক পরিচিত । অচিন গাছের গোড়ায় পশ্চিমে মাইজউদ্দিন পাগলার সংরক্ষিত আসন। পূর্বে অদূরে রয়েছে খান্কা শরীফ। আর দক্ষিণে রয়েছ নূরা পাগলার কবর। বর্তমানে খাদেম হিসেবে রয়েছেন রুহুল আমীন। তিনি প্রতি সোমবার সন্ধ্যায় খানকাতে বসেন। ভক্তদের সাথে কথা বলেন, সমস্যার সমাধান দেন। খাদেম রুহুল আমীন (আঃ হাকিম) বলেন, ভাল নিয়তে অচিন গাছের পাতা খেলে উপকার হয়। দুর দুরান্ত থেকে লোকজন এসে ঔষধ নিয়ে যায়।

এছাড়াও রজব ও মহরম মাসের ১৪ তারিখে বাৎসরিক ওরস হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি এসে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন গাছটির নাম বের করার জন্য। গাছটির কোন বংশধর কোথায় লুকিয়ে আছে কিনা, তাও বলতে পারছেনা। একজন বৃদ্ধ নূরু মিয়া বলেন, সম্ভবত গাছটি কোন রাজা বা কোন জমিদার রোপন করে গেছেন। এলাকার অনেক প্রবীণ ব্যক্তি আফসোস করে বলেন, হায়রে এমন গাছ জন্মালো যার নাম নেই। ৮০ বছরের এক বৃদ্ধ বলেন, মরার আগে যদি গাছটির নাম জেনে নিতে পারতাম, তাহলে ধন্য হতাম। এত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও গাছটির সঠিক নাম না জানায় হতাশ হননি রূপগঞ্জের এক মাদ্রাসা শিক্ষক আবু হানিফ। তিনি বলেন, ১৮ হাজার সৃষ্টির বাইরে কোন সৃষ্টিতো নেই। অবশ্যই একদিন এ গাছটির নাম জানা যাবে।
এই অচিন বৃক্ষের সঠিক নাম আদৌ কোন দিন জানা যাবে কি এমন প্রশ্ন রূপগঞ্জ এলাকাবাসীর। কালের সাক্ষী হয়ে নামহীনভাবেই আজীবন দাড়িয়ে থাকবে প্রাচীন এই গাছটি, নাকি কোন একদিন বাড়ীর পাশের অচিন তলার অচিন গাছটির নাম আবিস্কার করবে পরবর্তী কোন প্রজন্ম। উপজেলা বন কর্মকর্তা রিয়াজউদ্দিন আহম্মেদ মৃধা বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে গাছটির পরিচয় জানার চেষ্টা করব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *