ঢাকা, সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০৭:১৬ অপরাহ্ন
সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকু, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এক নেপথ্য নায়ক
স্টাফ রিপোর্টার

১৯৭১ সালের ৫ মার্চ একটি পুলিশ ফাঁড়ি দখল করে পাকিস্তানের পতাকা জ্বালিয়েছেন আবার ওই জায়গায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছেন। পাক জান্তাদের হুলিয়া মাথায় নিয়ে ২৫শে মার্চের আগেই দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। যুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কোলকাতা মিশনে বিনা বেতনে কাজ করেছেন আবার দেশ থেকে টাকা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতাও করেছেন।

যাকে নিয়ে এই কথাগুলো বলা হচ্ছে তিনি আর কেউ নন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এক নেপথ্য নায়ক সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকু। পৈতৃক নিবাসী মৌলভীবাজারের বড়লেখায় হলেও সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকুর জন্ম ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি পিতার ব্যবসায়িক কর্মক্ষেত্র কমলগঞ্জের শমসেরনগরের এয়ারপোর্ট রোডস্থ বাসভবনে।

লেখাপড়ার হাতেখড়ি শমসেরনগরের অধুনা নামলুপ্ত রামচিজ রাম প্রাইমারি স্কুলে। এরপর এসএসসি শমসেরনগরের এ এটি এম হাই স্কুল থেকে।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনে তিনি বৃহত্তম সিলেটের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার বলে পরিচিত মদন মোহন কলেজের ছাত্র। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দেই তিনি বাণিজ্য বিষয়ে মদনমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে চট্টগ্রাম বাণিজ্য কলেজে ডিগ্রি ক্লাসে ভর্তি হন।

৩ মার্চ ১৯৭১ সালে ঢাকায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে সামনে রেখে চারিদিকে থমথমে শ^াসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামে হানাদার সামরিক জান্তা অস্ত্র মজুদ করা শুরু করে দিয়েছে। বাঙালি ও অবাঙালি দাঙ্গা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এমনই এক সময়ে ৪ মার্চ সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকু চট্টগ্রাম থেকে শমসেরনগরে চলে আসেন। ৫ মার্চ শমসেরনগরে সর্বদলীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার মানুষ উক্ত সমাবেশে যোগদান করে। সমাবেশ শেষে শুরু হয় মিছিল। মিছিলটি যখন শমসেরনগর চৌমুহনা অতিক্রম করছে ঠিক ওই সময়ে শমসেরনগরের অসীম সাহসী কয়েকজন তরুণ এম এ রহিম, নারায়ণ সুকুমার, সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকু ও সৈয়দ জসীম উদ্দিন স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে যান। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও শমসেরনগরের পুলিশ ফাঁড়ি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফাঁড়িতে উত্তোলণ করা পাকিস্তানের পতাকা তাঁরা নামিয়ে দেন। উত্তোলন করেন লাল-সবুজের পতাকা।

ঢাকার বাইরে বাংলাদেশের সর্ব প্রথম পতাকা উত্তোলনের গৌরব অর্জনকারীদের একজন হয়ে ইতিহাসের এক বিরল সম্মানে ভূষিত হয়ে ওঠেন সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকু।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অগ্নিগর্ভা শমসেরনগর-এর সংগ্রামী উপাখ্যান ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত আর এই শমসেরনগরকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত করতে এর সূচনালগ্নে যে কয়জন মানুষের অবদান ইতিহাসের পাতায় জ¦লজ¦ল করে জ¦লছে সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকু হচ্ছেন তাদেরই একজন।

৫ মার্চের ঘটনার প্রেক্ষিতে ৬ মার্চ এম এ রহিম, নারায়ণ, লুকু ও সুকুমারের উপর হুলিয়া জারি হয়। ইতিমধ্যেই এম এ রহিম ও নারায়ণকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।

পুলিশ হন্যে হয়ে সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকুকে খুঁজতে থাকে। এমতাবস্থায় উপায়ন্তর না দেখে আত্মীয়স্বজন ও শমসেরনগরের নেতৃবৃন্দের পরামর্শে ২৫ মার্চের পূর্বেই লুকু চাতলাপুর সীমান্ত ফাঁড়ি অতিক্রম করে ভারতের করিমগঞ্জে প্রবেশ করেন।

কিছুদিন কাছাড়, করিমগঞ্জ ও কৈলাশহরে বাস করে চলে যান কোলকাতা। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে পুরোদমে যুদ্ধ চলছে। কোলকাতার পাকিস্তান উপ হাইকমিশন বাংলাদেশ মিশনে রূপান্তরিত হয়েছে। সৈয়দ নাজমুল ইসলাম লুকু কোলকাতাস্থ বাংলাদেশ মিশনে কাজ নেন এবং বিনা পারিশ্রমিকে এর দৈনন্দিন কার্য সম্পাদনে সহযোগিতা করেন।

তিনি তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরীর (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী) পরামর্শে গোপনে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এলাকায় এসে তিনি তাঁর প্রবাসী আত্মীয় স্বজনের এবং পরিবারের  সি ত অর্থ নিয়ে পুনরায় দেশত্যাগ করে সমুদয় অর্থ নিয়ে পুনরায় দেশত্যাগ করে সমুদয় অর্থ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের যুদ্ধ তহবিলে দান করেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর লুকু চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে বিকম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উচ্চশিক্ষার্থে লন্ডন আসেন এবং বেশ কিছুদিন সেন্ট্রাল লন্ডন কলেজে লেখাপড়া করেন।

=ইতিমধ্যেই তিনি ব্রিটেনে স্থায়ী হয়ে যান এবং স্কটল্যান্ড গিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী লুকু ১৯৮৭-১৯৮৮ সেশনে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন স্কটল্যান্ডের সহ সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

প্রচার ও মিডিয়াবিমুখ মানুষটি দেশে-বিদেশে অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক এবং বর্তমানে লন্ডনেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

রণাঙ্গনের সেই যুদ্ধার নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় নাই, সৈয়দ মাসুমের লিখিত বিলেতে কমলগঞ্জের শতজন পুস্তিকা থেকে তুলে ধরা হলো। মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় ও দেশ রত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টি কামনা করি, অনতিবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে দেশমাতৃকা স্বাধীন করার জন্য জীবন বাজী রেখেছেন, তাকে তালিকাভুক্ত করে যথাযত সম্মান দেওয়ার জোড় দাবি জানাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x