ঢাকা, সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০৭:০৪ অপরাহ্ন
করোনায় বন্ধ কিন্ডারগার্টেন স্কুল, মানবেতর জীবনযাপন শিক্ষকদের
আরিফ প্রধান :

করোনা কালীন সময়ে গাজীপুরের শ্রীপুরে পাঁচ শতাধিক কিন্ডারগার্টেন স্কুল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় বেতন ভাতা না পেয়ে এসব স্কুলে কর্মরত প্রায় আট হাজার শিক্ষক কর্মচারী দারুণ ভাবে অর্থ সংকটে পড়েছেন। মানবেতর জীবনযাপনও করছেন অনেকে।

ব্যক্তি পর্যায়ে গড়ে উঠা স্কুল গুলোর পরিচালকগন শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও ভবন ভাড়া পরিশোধ করতে না পাড়ায় অনেক স্কুল বন্ধ হবার পথে। আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে নিরুপায় হয়ে অনেক শিক্ষকগনই পেশা পরিবর্তন করে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন স্কুলের পরিচালকগনের সাথে কথা বলে জানাযায় উপজেলার ১টি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ৫’শ ১৭টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। এসব স্কুলে কর্মরত আছেন প্রায় আট হাজার শিক্ষক কর্মচারী। অধ্যয়নরত আছে এক লাখের বেশী শিক্ষার্থী।

করোনায় দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গত ১৭ মার্চ ২০ইং তারিখ থেকে সরকারী ঘোষণায় বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে বন্ধ হয়ে যায় কিন্ডারগার্টেন স্কুল গুলো। ব্যক্তি পর্যায়ে গড়ে উঠা এসব স্কুল সম্পুর্ণ শীক্ষার্থীদের বেতনের আয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকার কারণে বেতন আদায় করতে না পারায় পরিচালকদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিচালকরা কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা ও স্কুল ভবনের ভাড়া পরিশোধ করতে পারছেন না।

দীর্ঘ সময় বেতন ভাতা না পেয়ে শিক্ষক কর্মচারীগন আর্থিক  সংকটে পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। নিরুপায় হয়ে অনেক শিক্ষক পেশা পরিবর্তন করে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। অনেক শিক্ষক সংসারের ভরণ পোষণ করতে সহায় সম্বল শেষ করে ফেলেছেন। অনেকে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছেন।

বরমীর পাইটালবাড়ি এলাকার সুফিয়া মডেল একাডেমির প্রধান শিক্ষক মোঃবোরহান উদ্দিন আর্থিক সংকটে হতাশ হয়ে পরেছেন। পৌর শহরের মোহাম্মদ আলী একাডেমির শিক্ষক মোঃ রফিকুল ইসলাম শিক্ষকতা ছেরে এখন বাড়িতে গরু লালন পালন করেন। লোহাগাছ মডেল একাডেমির পরিচালক মোঃ মোস্তফা শিক্ষকতা ছেরে তরকারীর ব্যবসা করছেন। আত্নসম্মানের ভয়ে ভোক্তভোগী এসব শিক্ষকরা কারোকাছে হাত পাততেও পারছেনা। করোনা কালীন সময়ে অসহায় মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে সরকার জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি। সমস্যাগ্রস্থ্য এসব শিক্ষদের পাশে দাড়ায়নি কেউ।

শ্রীপুর পৌর শহরের টেংরা রাস্তার মোড়ে অবস্থিত সেন্ট্রাল মডেল স্কুলের পরিচালক সারোয়ার  হোসেন আক্ষেপের সাথে বলেন -ইতিপূর্বে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকদের সরকারের পক্ষ থেকে সামান্য অনুদান দেয়ার জন্য প্রায় তিনবার শিক্ষকদের আপডেট কাগজপত্র জমা নিয়েছে স্থানীয় প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস কর্তৃপক্ষ।কিন্তু প্রায় দু বছর হয়ে গেলেও এ ধরনের উদ্যোগে আলোর মুখ দেখিনি।তিনি আরও বলেন সরকারের মন্ত্রী,এমপি’রা সবাই কিন্ডারগার্টেনে কর্মরত শিক্ষকদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে। অথচ দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অবদান অনস্বীকার্য।

শ্রীপুর পৌর সহরের মোহাম্মদ আলী একাডেমির পরিচালক মোহাম্মদ রেজানূর রহমান জানান, ভাড়া করা ভবনে তাঁর পরিচালিত স্কুলে ৩২ জন শিক্ষক কর্মরত ছিল। শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৪ শত  ষোল জন। দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের বেতন ভাতা ও ভবন ভাড়া দিতে পাছেন না। ফলে শিক্ষকরা চলে যাচ্ছে স্কুল ছেড়ে অন্য পেশায়। ২ শতাধিক ছাত্র ছাত্রী স্কুলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা না করায় ঝড়ে পরার আশংকা করছেন তিনি।

মাওনা চেরৈাস্তার ন্যাশনাল মেরিট একাডেমির পরিচালক মোঃ সাহাবউদ্দিন ফরাজী জানান, তার পরিচালিত স্কুলে ২৫ জন শিক্ষক কর্মরত ছিল। ছাত্র ছাত্রী ছিল চার’শতাধিক। করোনায় দীর্ঘ বন্ধের কারণে ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী ঝড়ে পরার আশংকা করছেন তিনি। স্কুল ধরে রাখতে অন্য ব্যবসা থেকে টাকা এনে শিক্ষকদের কিছু বেতন দিচ্ছেন।

জৈনা বাজারের এইচ এ কে একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাহিন সুলতানা বলেন ছয়’শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত তার স্কুলে ৩২জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। স্কুল ধরে রাখতে শিক্ষকগন কে ব্যক্তি গত ভাবে কিছু বেতন দিচ্ছেন।

বরমীর সান রাইজ মডেল একাডেমি এন্ড হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোঃ হারুন অর রশিদ ফরাজী জানান, মাসিক চব্বিশ হাজার টাকা ভাড়া করা ভবনে তার পরিচালিত স্কুলে দু’শ ৮৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। কর্মরত আছেন ১৮ জন শিক্ষক। করোনার কারণে বেতন আদায় বন্ধ থাকায় ১৪ মাস যাবৎ ভবন ভাড়া ও শিক্ষক দের বেতন দিতে পারছেন না। শিক্ষকরা স্কুল ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী ঝড়ে পরপর আশংক্ষা করছেন তিনি।

উপজেলা কিন্ডারগার্টেন স্কুল এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহাম্মেদ মিলনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ই.আই.এন নাম্বার ভূক্ত ২০টি স্কুলের ৫’শ ১৬ জন শিক্ষক প্রধম ধাপে পাঁচ হাজার টাকা করে সরকারী সহায়তা পান। অন-লাইন আবেদনের মাধ্যমে দ্বিতিয় ধাপে ওই স্কুল গুলোর কর্মরত শিক্ষক গনের মধ্যে দেড় শতাধিক শিক্ষক পাঁচ হাজার টাকা করে সরকারী সহায়তা পান। ই আই এন কোড নাম্বার ভূক্ত মাধ্যমিক স্তরে পাঠ দান কারী শিক্ষকরা সহায়তা পেলেও ই এম আই এস কোড নাম্বার ভূক্ত প্রাথমিক স্তরে পাঠ দান কারী শিক্ষকরা রয়ে যায় সহায়তার বাইরে।

উপজেলা প্রাইভেট স্কুল এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ খলিলুর রহমান খোকা বলেন, করোনার দীর্ঘ বন্ধের কারণে সম্পুর্ণ ব্যক্তি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্টেন স্কুল গুলোর আয়ের উৎস ছাত্র বেতন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্কুল পরিচালকরা শিক্ষক দের বেতন দিতে পারেনি। পরিশোধ করতে পারেনি ভবনের ভাড়া। আর্থিক সংকটে পরে কর্মরত শিক্ষকরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে লিটল ফ্লাওয়ার একাডেমি,রেসিডেনসিয়াল স্কুল, দিলরোবা একাডেমি, মাইজ পাড়া মডেল একাডেমি সহ বেশ কটি স্কুল।

উপজেলা কিন্ডারগার্টেন স্কুল এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, করোনা কালীন সময়ে আর্থিক সংকটে পড়ে ভাড়া করা প্রতিষ্ঠান গুলো বন্ধের দ্বার প্রান্তে। তিন দফা তালিকা দেয়ার পর  ই আই এন নাম্বার ভূক্ত স্কুল গুলোর শিক্ষরা সরকারী সহায়তা পেয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষকরা সরকারী সহায়তা পাননি। বেতন ভাতা না পেয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে শিক্ষকরা ঝড়ে পরছে শিক্ষার্থী।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ কামরুল হাসান জানান, সহায়তার জন্য তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে। কেউ স্কুল বন্ধের আবেদন করেনি। কোন স্কুল বন্ধ হয়েছে এমনটি তার জানানেই খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ নূরুল আমীন জানান, কিন্ডার গার্টেন স্কুলের কিছু শিক্ষক সরকারী সহায়তা পেয়েছেন। এসব স্কুলে কর্মরত শিক্ষকদের তালিকা তৈরী করে জেলা শিক্ষা অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে। কত গুলো স্কুল বন্ধ হয়েছে এমনটি তার জানানেই। কেউ স্কুল বন্ধের বিষয়ে আমাদের সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ করেনি। খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

One response to “করোনায় বন্ধ কিন্ডারগার্টেন স্কুল, মানবেতর জীবনযাপন শিক্ষকদের”

  1. … [Trackback]

    […] Read More here on that Topic: doinikdak.com/news/47050 […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x