ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:২৫ অপরাহ্ন
মুহাররামের সওগাত : মারজান আহমদ চৌধুরী
দৈনিক ডাক অনলাইন ডেস্ক
লেখক: হাফিজ মারজান আহমেদ চৌধুরী ফুলতলী

পবিত্র মুহাররাম সমাগত। প্রত্যেকবার হিজরি নববর্ষের প্রারম্ভে মনের ভেতর জমে থাকা কয়েকটি ক্ষত পুনরায় তাজা হয়ে যায়। প্রথম ক্ষত কারবালা প্রান্তরে আহলে বাইতের শাহাদাত। এ ঘটনাটি আমাদের নবী ﷺ-কে কতটা কষ্ট দিয়েছিল, তা আমরা অনুভবও করতে পারব না। রাসূল ﷺ বলেছিলেন, “খেয়াল রাখবে, আমার পরে তোমরা আমার আহলে বাইতের সাথে কীরূপ আচরণ করছ” [তিরমিযী, ৩৭৮৮]। অথচ এ উম্মাতের কিছু লোক কারবালার মতো নির্মম ঘটনার জন্ম দিয়েছে। উম্মে সালামাহ রা. বলেছেন, “আমি একদিন রাসূল ﷺ-কে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁর মাথা ও দাড়িতে মাটি লেগে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, কী হয়েছে? তিনি বললেন, এইমাত্র দেখে এলাম হুসাইনকে হত্যা করা হয়েছে” [তিরমিযী, ৩৭৭১]। ইবন আব্বাস রা. বলেছেন, “আমি এক দুপুরে নবী ﷺ-কে স্বপ্নে দেখলাম। চুল অবিন্যস্ত, চেহারা ধুলোমাখা, হাতে এক শিশি রক্ত। জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার হাতে কী? তিনি জবাব দিলেন, হুসাইন ও তার সাথীদের রক্ত। আমি সকাল থেকে এগুলো সংগ্রহ করছি” [মুসনাদে আহমাদ, ২১৬৫]। আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক সেই যালিমদের ওপর, যারা খানদানে রাসূলের সাথে এত বড় যুলম করেছে।

দ্বিতীয় ক্ষত হচ্ছে কারবালার প্রেক্ষাপট। অর্থাৎ খলিফা উসমান রা. এর শাহাদাত থেকে শুরু হওয়া ফিতনা, খলিফা আলী রা. এর বিরুদ্ধে সিরিয়ার গভর্নরের বিদ্রোহ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, খারিজীদের হাতে মাওলা আলী রা. এর শাহাদাত, হাসান রা. এর পদত্যাগের মাধ্যমে খিলাফাতে রাশিদার সমাপ্তি, এরপর বনু উমাইয়ার রাজতন্ত্রের সূচনা, মাওলা আলীকে গালিগালাজ, আহলে বাইতের প্রতি দুর্ব্যবহার, সাহাবিদেরকে অবমাননা, ফাসিক ইয়াযিদকে মনোনয়ন এবং ইয়াযিদের পক্ষে জোরপূর্বক বাইআত গ্রহণ– মোটকথা ৩৫ হিজরি থেকে শুরু হয়ে যে যে স্তর অতিক্রম করে ৬১ হিজরির ১০ই মুহাররাম কারবালা সংঘটিত হয়েছিল, সেই ইতিহাস কারবালার মতোই বেদনাদায়ক। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কারবালা ও হাররার যুদ্ধ আচমকা ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। এগুলো বনু উমাইয়ার ‘দাঁত দিয়ে কেটে খাওয়া’ অত্যাচারী রাজতন্ত্রের অবশ্যম্ভাবী ফলাফল।

তৃতীয় ক্ষত হচ্ছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ঘরের ভেতর। যেভাবে রাফিজীরা নিজেদেরকে ‘শিয়াতু আলী’ বা ‘আলীর দল’ দাবী করে খুলাফায়ে রাশিদীনকে গালিগালাজ করে, সেভাবে আহলে সুন্নাতের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা নাসিবীরা নিজেদেরকে সুন্নী দাবী করে মাওলা আলী, ইমাম হুসাইন ও আহলুল বাইতের প্রতি বিদ্বেষের বীজ বপন করে। রাফিজীরা প্রথম তিন খলিফার প্রতি আহলে বাইতের সাথে ষড়যন্ত্র করা, তাঁদের হক নষ্ট করা এবং তাঁদেরকে অত্যাচার করার মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। এরা সায়্যিদা আয়িশা রা. এর প্রতি অশ্লীলতার অপবাদ দিতেও পিছপা হয় না। এসব মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর লা’নত বর্ষিত হোক।

অপরদিকে নাসিবীরা মুহাররাম কাটিয়ে দেয় ইয়াযিদ কতটা নির্দোষ, সেটি প্রমাণের চেষ্টায়। রোমান সম্রাজ্যে অভিযান বিষয়ক একটি হাদীসকে জবরদস্তী ইয়াযিদের দিকে ঠেলে দিয়ে তাকে জান্নাতি বানাতে চায়। অথচ এ হাদীস কোনোভাবেই ইয়াযিদের ক্ষেত্রে মানানসই নয়। বরং ইয়াযিদের দিকে ইঙ্গিত করে রাসূল ﷺ বলেছেন, “কুরাইশ বংশের তরুণদের হাতে আমার উম্মাতের বিনাশ হবে” [সহীহ বুখারী, ৩৬০৫]। আবু হুরায়রা রা. ৬০ হিজরি থেকে (যে বছর ইয়াযিদ ক্ষমতায় বসেছে) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। বলতেন, আমি রাসূল ﷺ থেকে এমন কথা জেনেছি, যা বললে তোমরা (বনু উমাইয়ার লোকেরা) আমার গর্দান কেটে দেবে [ফাতহুল বারী, সহীহ বুখারী, ১২০]। ইয়াযিদকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সেই দলের মধ্যে, যাদের ওপর সৌদি রাজতন্ত্রের দয়া ও দান সবচেয়ে বেশি বর্ষিত হয়। সহীহ হাদীসের পরিবর্তে ইতিহাসের পাতা থেকে মনগড়া তথ্য উপস্থিত করে তারা ইয়াযিদ ও বনু উমাইয়ার শাসনকে ‘ভালো’ প্রমাণ করতে চায়। অথচ রাসূল ﷺ এ ধরণের শাসনকে “দাঁত দিয়ে কেটে খাওয়া রাজতন্ত্র” বলেছেন [মুসনাদে আহমাদ, ১৮৪০৬]। আবদুর রাহমান ইবন আবু বকর রা. বলেছেন “রোম-পারস্যের মতো রাজতন্ত্র” [ফাতহুল বারী, সহীহ বুখারী, ৪৮২৭]। সাফিনা রা. বনু উমাইয়ার শাসনকে বলেছেন “নিকৃষ্টতম রাজতন্ত্র” [তিরমিযী, ২২২৬]।

নাসিবীদের আরেকটি কৌশল হচ্ছে, কারবালার যুদ্ধ এবং এর প্রেক্ষাপটকে পাশ কাটিয়ে পুরো মুহাররাম কেবল শিয়াদের নিন্দা করা। আর কারবালার কথা আসলে হুসাইন রা. এর ওপর দোষ দেয়া। তারা বলে, হুসাইন রা. খলিফার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তাই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ এটিও জানে না যে, ‘খলিফা’ কাকে বলে। সায়্যিদুনা উমর রা. এর ফাতওয়া হচ্ছে, “যে ব্যক্তি মুসলমানদের পরামর্শ ব্যতীত কাউকে খিলাফাতের বাইআত দিল, তাহলে যে বাইআত দিল আর যার হাতে দেয়া হলো, কারও অনুসরণ করা যাবে না” [সহীহ বুখারী, ৬৮৩০]। ইয়াযিকে মুসলমানদের পরামর্শ নিয়ে মনোনিত করা হয়নি। একক ইচ্ছায় নাম ঘোষণা করে তার পক্ষে জোরপূর্বক বাইআত নেয়া হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম এর প্রতিবাদ করেছিলেন [সহীহ বুখারী, ৪৮২৭]। তাই ইয়াযিদকে আমির বা খলিফা বলার কোনো ভিত্তি নেই। অপরদিকে হুসাইন রা. চেয়েছিলেন উম্মাতকে আবার খিলাফাতে রাশিদার আদর্শের ওপর ফিরিয়ে নিতে। কারণ হুসাইনের নানাজান ﷺ বলে গেছেন, “তোমার জন্য রইল আমার সুন্নাত এবং আমার সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত। তোমরা এগুলো মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো” [আবু দাউদ, ৪৫০৭; ইবন মাজাহ, ৪২]।

তবে হুসাইনি আদর্শ যে এখনও উঁচু রয়েছে, এর মূল কৃতিত্ব আমাদের হাদীসের ইমামগণের। তাঁরা হক কথা বলার হক আদায় করেছেন। সমসাময়িক যুগে আমি যাদেরকে হুসাইনি আদর্শের সেনাপতি হিসেবে জেনেছি, তন্মধ্যে মুফতি সায়্যিদ আমীমুল ইহসান (মৃ. ১৯৭৪), সায়্যিদ মুহাম্মাদ ইবন আলাওয়ী মাক্কী (মৃ. ২০০৪) এবং আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (মৃ. ২০০৮) অগ্রগণ্য। আহলে হাদীসের মধ্যে হুসাইনি আদর্শের সবচেয়ে বড় (সম্ভবত একমাত্র) সেনাপতি ছিলেন পাকিস্তানের মাওলানা ইসহাক মাদানী (মৃ. ২০১৩)। তিনি এতটাই হুসাইনি যে, তাঁর দলের ৪০ জন ‘ঠিকাদার’ ঘোষণা দিয়ে তাঁকে আহলে হাদীস থেকে ত্যাজ্য করেছে। এরপর আসে আল্লামা ড. তাহির-উল-কাদরীর নাম। বেরেলভী (আলা হযরত) মাসলাকের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজ মাসলাকের উলামার সমর্থন পাননি। বরং হুসাইনি আদর্শের পাহারাদারি তাঁকে একাই করতে হচ্ছে। দেওবন্দী মাসলাকে হুসাইনি সেনানী হিসেবে পেয়েছি ভারতের মাওলানা সালমান নদভী এবং তাবলীগ জামাতের মাওলানা তারিক জামিল। এদেরকেও নানা কটুক্তি সহ্য করতে হয়। অবশ্য আহলে বাইতের মাহাব্বাতের জন্য ইমাম শাফিয়ীকে ‘রাফিজী’ অপবাদ শুনতে হয়েছিল। এরকম আরও আছেন। আমি শুধু আমার পরিচিতদের কথা বলছি।

আহলে বাইতের মাহাব্বাত এবং হক বলতে গেলে গালি খেতে হবেই। তবে সত্য গোপনকারীদের কানাঘুষা, নাসিবীদের গালাগালি কিংবা ‘শিয়া’ ট্যাগ লাগার ভয়ে যদি আমরা হুসাইনি আদর্শের সাথে আপোষ করি, তাহলে আহলে সুন্নাতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। কারণ আহলে সুন্নাত টিকে আছে খুলাফায়ে রাশিদীন, সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে বাইতের আদর্শের ওপর। আহলে সুন্নাতের প্রথম ‘ইমাম’ সায়্যিদুনা আবু বকর সিদ্দীক রা. বলেছেন, “তোমরা মুহাম্মাদ ﷺ এর নৈকট্য অর্জন করো তাঁর আহলে বাইতের (মাহাব্বাতের) মাধ্যমে” [সহীহ বুখারী, ৩৭১৩]। অতএব মুহাররাম হোক হুসাইনি আদর্শের অনুসারীদের মাস। হুসাইনি কণ্ঠগুলো এত উঁচু হোক, যাতে রাফিজী ও নাসিবীদের বিষমিশ্রিত কানাকানি নিচে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। আপনাদের সবাইকে হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা।

* হাদীসের নম্বর মাকতাবাতুশ শামিলা অনুসারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x