ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৫:২৭ পূর্বাহ্ন
বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ দাফনে এলাকাবাসীর বাঁধা, গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন
এম আনোয়ার হোসেন, মিরসরাই

করোনায় মারা যাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ দাফনে এলাকাবাসীর বাঁধা, গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন

মিরসরাইয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্ল্যাহর লাশ দাফনে বাঁধা দিয়েছে গ্রামের বাসিন্দারা তাই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার ছাড়াই তাঁকে দাফন করা হয়েছে। গ্রামবাসীর বাঁধা দেওয়ার পরবর্তীতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শেষ বিদায়ের বন্ধু সংগঠনের সদস্যরা লাশের গোসল ও দাফনের ব্যবস্থা করেন।

জানা গেছে, উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের পশ্চিম জোয়ার গ্রামের আবদুর রশীদ মুহুরী বাড়ীর বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্ল্যাহ গত ৩০ জুলাই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার (৩ আগষ্ট) দিবাগত রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার স্ত্রী লুৎফুর নাহার (৬৫) ও তার পরিবারের ৫ সদস্যও বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত। মৃত্যুর পর তাঁর ২ ছেলে চট্টগ্রাম থেকে লাশ দাফন কাফনের জন্য বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাড়ির লোকজন ও গ্রামীবাসীর বাঁধা দেয়। পরবর্তীতে তাঁরা মিরসরাই সদর ইউনিয়নের শেষ বিদায়ের বন্ধু সংগঠনের কার্যালয়ে বাবার লাশ নিয়ে ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। বুধবার (৪ আগষ্ট) সকালে শেষ বিদায়ের বন্ধু সংগঠনের কার্যালয়ে লাশের গোসল শেষে এ্যাম্বুলেন্সে করে কবরস্থানে গ্রামের বাড়িতে লাশ নিয়ে যান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্ল্যাহর ছেলে হোসেন মো. জাহাঙ্গীর বলেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাবার মৃত্যুর পর গ্রামের লোকজন লাশের গোসল করানো, কবরের মাটি খোঁড়া ও দাফন করতে পারবেনা বলে জানান। আমাদের বাড়ীর গালিব নামে একজন বাড়ীর প্রবেশমুখে বাঁশ পুঁতে দেয়; যাতে এ্যাম্বুলেন্স বাড়ীতে প্রবেশ করতে না পারে। পরবর্তীতে বিষয়টি করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়নকে জানালে তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শেষ বিদায়ের বন্ধুর মাধ্যমে লাশ পরিবহন ও গোসলের ব্যবস্থা করেন। লাশ বাড়ীতে নেওয়ার পর গ্রামের মসজিদের ইমাম জানাযার নামাজ পড়াতে অস্বীকৃতি জানালে শেষ বিদায়ের বন্ধুর করেরহাট ইউনিয়ন টিম লিডার মাওলানা ইসমাঈল নামাজের ইমামতি করেন।

তিনি আরো বলেন, আমি বুধবার সকাল ৬ টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসায় যাই বাবার মৃত্যুর খবরটি দেওয়ার জন্য। তিনি ঘুমে থাকায় দেখা করতে পারিনি। তবে নিরাপত্তা প্রহরীকে বাবার মৃত্যুর বিষয়টি অবহিত করে এসেছি। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কবির আহমেদকে মোবাইলে বাবার মৃত্যু ও জানাযার সময় সকাল ৯ টায় নির্ধারণের বিষয়টি জানাই। তিনি গার্ড অব অনারের বিষয়ে ইউএনওকে জানাবেন বলে আমাকে আশ^স্ত করেন।
করেরহাট ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নুরুল আবছার বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্লাহ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার বিষয়টি শুনেছি। আমি নিজেও অসুস্থ হওয়ায় জানাযায় যেতে পারিনি। তাঁর বাড়ি ও গ্রামবাসীর বিরোধীতার কারণে পরিবারের লোকজন তাড়াহুড়া করে দাফন করে চলে গেছে বলে শুনেছি।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শেষ বিদায়ের বন্ধু সংগঠনের সমন্বয়ক (সেবা) নিজাম উদ্দিন বলেন, করোনায় আক্রান্ত্র হয়ে মৃত্যুবরণ করা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্ল্যাহ’র দাফন কাফনে এলাকাবাসী বাঁধা দেয়। পরবর্তীতে করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন ও তাঁর ছেলে হোসেন মো. জাহাঙ্গীরের আবেদনের প্রেক্ষিতে লাশের গোসল, জানাযা ও দাফনের ব্যবস্থা করেন শেষ বিদায়ের বন্ধু সংগঠনের সদস্যরা। যেখানে শেষ বিদায়ের বন্ধু সংগঠনের ক্বারি নোমান, ইসমাঈল বিন মোজাম্মেল, মাওলানা তাজুল ইসলাম, ওমর ফারুক, মাওলানা মাহমুদ হোসেন, নুরুল আবছার, এরাদুল হক উপস্থিত ছিলেন।করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্ল্যাহ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করায় তাঁর বাড়ীর লোকজন বিশেষ করে গালিব উল্লাহ লাশ দাফনে বাঁধা দেয়। সে বাড়ীর প্রবেশমুখে বাঁশ বেঁধে এ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাঁধা দেয়। পরবর্তীতে আমি, ইউপি সদস্য শহীদ ও নাসিম উদ্দিন রুবেল কবর খোঁড়ার ব্যবস্থা করি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শেষ বিদায়ের বন্ধু সংগঠনের মাধ্যমে লাশের গোসল, জানাযা ও দাফনের ব্যবস্থা করি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কবির আহমেদ বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্ল্যাহ’র লাশ দাফনের জন্য সকাল ১০টায় সময় নির্ধারণ করার কথা বলা হলেও তাঁর পরিবারের লোকজন সকাল ৯ টায় তাড়াহুড়া করে দাফন করে ফেলে। ফলে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়নি।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিনহাজুর রহমান বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজেদ উল্ল্যাহকে গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য সকাল ১০ টায় সময় নির্ধারণ করা হয়। উনার স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় পরিবারের লোকজন তাড়াতাড়ি করে সকাল ৯ টায় দাফন করে শহরে চলে যায়। সেজন্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া যায়নি।
তিনি আরো বলেন, লাশ দাফনে গ্রামবাসী বাঁধা দেওয়ার বিষয়টি আমি শুনিনি; এটি জানলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নিতাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x