ঢাকা, রবিবার ২৯ জানুয়ারী ২০২৩, ০৭:০৮ অপরাহ্ন
আজ ২১ জুন বিশ্ব সঙ্গীত দিবস
ভাস্কর সরকার

সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি সঙ্গীত অনুপম সুন্দর৷ মার্টিন লুথারের ভাষায় বলতে হয়, সঙ্গীত যে অপছন্দ করে তার মন রাতের মতো বিকল ৷ ৬৪ কলার মধ্যে সঙ্গীতকে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ কলা বিদ্যা। সঙ্গীত সম্পর্কিত প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ “সঙ্গীত পারিজাত” গ্রন্থের রচয়িতা অহোবল সঙ্গীতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “গীতং, বাদ্যং, নৃত্যং ত্রয়ং সঙ্গীত মূচ্যতে” অর্থাৎ গান, বাদ্য ও নাচ এই তিনটির সম্মিলিত রূপকেই সঙ্গীত বলে। কিন্তু শাস্ত্র যাই বলুক মনের কথা সুর দিয়ে প্রকাশ করাকেই সঙ্গীত বলা যায়; সে হোক যন্ত্র, মন্ত্র, কণ্ঠ কিংবা নৃত্যের মাধ্যমে। সঙ্গীতের উৎপত্তি মানব সৃষ্টির মতই অজানা। কখন ও কোথায় এ রহস্য কিন্তু আজও উন্মোচিত হয়নি। কোনটা কার আগে সৃষ্টি তার সঠিক তথ্য আজও মেলেনি। কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্ব অজ্ঞাত থাকলেও রয়েছে এর ধারাবাহিকতা। ধারাবাহিকতার আদলে উদ্ভব হয়েছিল সঙ্গীতের নতুন নতুন ধারা ও রূপ, আবার পালাক্রমে তা হয়েছে লুপ্ত। এবার বিশ্ব সঙ্গীত দিবস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়াস পাবো ৷

ফরাসী ভাষায় ‘ফেট ডে লা মিউজিক’ আর বাংলায় বিশ্ব সংগীত দিবস। ২১ জুন পালিত হয় বিশ্ব সংগীত দিবস। সে অর্থে আজ সঙ্গীতপ্রেমীদের সেই প্রতিক্ষিত দিন। এই দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের শুরুটা হয় ফ্রান্সে। বিশেষ এই মিউজিক ফেস্টিভ্যালকে ঘিরে ফ্রান্সে পালিত হয় সঙ্গীতবিষয়ক বৈচিত্র্যময় নানা আয়োজন। প্রথম থেকেই আলোচিত এই ফেস্টিভ্যালে অংশ নেবার জন্যে হাজির হতো বহু দেশের অসংখ্য সঙ্গীতজ্ঞ। ১৯৮২ সালেই বিশেষ এই সঙ্গীত উৎসবের দিনটি ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে’ হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করে। এর এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮১ সালে ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী জ্যাক লাঙ এই উৎসবকে একটি আন্তর্জাতিক রূপ দেবার চেষ্টা করেছিলেন।

আনুষ্ঠানিক যাত্রার এক বছরের মাথায় ২১ জুনকে বিশ্ব সঙ্গীত দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। ভালো লিরিক আর সুর সহো কন্ঠের যাদু ছুঁয়ে যায় সংবেদনশীল মানুষের মন। সঙ্গীতের নিজস্বতা আর স্বকীয়তা এতটাই প্রবল যে সেটা কোনো বিশেষ ভাষার কাছেও সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি। অর্থাৎ কোনো কাঁটা তারের বেড়া, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর সঙ্গীতকে বাধা দিতে পারে না। বিদেশের সঙ্গীতজ্ঞ বব ডিলান, মাইকেল জ্যাকসান কিংবা জিম মরিসনের সঙ্গীত যেমন এদেশের মানুষের মন ছুঁয়েছে, তেমনি আমাদের লালনের গানও পৌঁছে গেছে বিশ্বের দরবারে। প্রমাণ হয়েছে সঙ্গীতের ভাষাই বিশ্ব ভাষা৷ তাই সময়ের হাত ধরে বিশ্ব সঙ্গীতের দরবারে বাংলা গান এক বিশেষ স্থানে আসীন হয়েছে। বিশেষ করে বাংলা সঙ্গীতের মৌলিক ধারাগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে সমাদৃত হয়ে চর্চিত হচ্ছে। হাজার বছরের পুরোনো বাংলা সঙ্গীত আজ স্থানীয় চর্চার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোচ্চার হয়ে পথ চলছে।

বলা হয়ে থাকে, ধানের দেশ গানের দেশ বাংলাদেশ ৷ নানা ধরনের সঙ্গীত ধারার পীঠস্থান হলো বাংলাদেশ ৷ হাজারো পীর, ফকির, দরবেশ, বাউল ও লোককবির পূণ্যভূমির এই দেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের নানা বিভাগের পাশাপাশি লোকগানের উত্তরণ কখনো স্থিরতো ছিলই না বরঞ্চ অনেক গতিশীল ছিল। ভজন, কীর্তন,কবিগান, তরজা, ঝুমুর, যাত্রাগান, রামায়ণের গান, গাজীর পালা, পাঁচালী, মতুয়া, মনসা মঙ্গল, মহুয়ার পালা, রামপ্রসাদী, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, ধুয়া, জারি, সারি, মারফতি, মুরশিদি, বারাশিয়াসহ নানা ধরনের পালাগান, ব্রহ্মসংগীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসংগীত, জাগরণী, অতুল প্রসাদের গান, রজনীকান্তের গান, আধুনিক গান ও শ্যামাসংগীতসহ নানা রূপ ও ভাগে সমৃদ্ধ হয়ে আছে বাংলাগান।

এছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে সঙ্গীত শিক্ষাদানের জন্য উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জনসাধারণের মধ্যে সঙ্গীত বিষয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওস্তাদ মুন্‌শি রইসউদ্দীন, বারীন মজুমদার, অধ্যক্ষ সুরেশ চক্রবর্তী, ওস্তাদ ফজলে হক, পণ্ডিত জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদবরণ বড়ুয়া, ওস্তাদ মিহির লালা, পণ্ডিত রামকানাই দাস, সুধীন দাশ, সনজিদা খাতুন প্রমুখগণ অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ব্যক্তিপর্যায়ে গড়ে তোলেন সঙ্গীত বিদ্যালয়- মহাবিদ্যালয়। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় গড়ে উঠে শিশু একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী। যদিও করোনার কারনে একটু স্থিমিত হয়ে আছে তবুও আজকাল নিয়মিত সঙ্গীত সম্মেলন হয় ঢাকা, রাজশাহী, নাটোর, নারায়ণগঞ্জ,বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, খুলনা, দিনাজপুর প্রভৃতি শহরে। বাহারি লোকজ সঙ্গীতের পাশাপাশি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এ সকল কীর্তিমান সঙ্গীতজ্ঞগণ শুধু এ উপমহাদেশ নয়, সমৃদ্ধ করেছেন বিশ্বসঙ্গীতের ভাণ্ডারকে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় শাস্ত্র ও ধর্মীয় সঙ্গীতকে আশ্রয় করে বাংলা সঙ্গীত আজ প্রসারিত হচ্ছে আগামীর উঠানে। আমাদের লোকগান জারি, সারি, বাউল প্রভৃতি কিংবা রবীন্দ্র বা নজরুলগীতির মতো সমৃদ্ধ সঙ্গীতের আকর বাংলা সঙ্গীতকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছে। আধুনিক গানের ব্যাপক চর্চা সেই সঙ্গীতের ধারাকে অব্যাহত রেখেছে। বৈচিত্র্যময় সুরের ধারার সঙ্গীত এগিয়ে চলুক বিশ্বচরাচরে।

বিশ্ব সঙ্গীত দিবস উপলক্ষে প্রতি বছরই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদসহ সঙ্গীতের বিভিন্ন সংগঠন যথাযোগ্য মর্যাদায় বর্ণিল আয়োজনে দিবসটি পালন করে। এবার সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে কোথাও দিবসটি জাঁকজমক ভাবে পালিত হচ্ছে না। তবে অনেক সংগঠন ভার্চুয়্যাল মিডিয়াতে দিবসটি পালন করবে৷ পরিশেষে বলতে হয়, সঙ্গীত হোক মানবের প্রাণের স্পন্দন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x